রোস্তম ফকির (পর্ব -০৩)

শহীদুল ইসলাম প্রামানিক

সন্ধার পরে অনেকেই রোস্তম ফকিরকে খুঁজল, কিন্তু দেখা পেল না। কানু মন্ডল গরু রাখার জন্য অস্থায়ি একটি ছাপড়া গোয়াল তুলেছিল, তারই আড়ালে একটি ছেঁড়া ছালা বিছিয়ে চুপ করে না খাওয়া অবস্থায় শুয়ে থাকল। ভোরে ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজ পড়ে কিছুক্ষণ রাস্তার উপর বসে থেকে বেলা উঠার পর পর আস্তে আস্তে উত্তর দিকে রওয়ানা হলো। রাস্তায় যাদের সাথে দেখা হলো তারা অনেকটা আগ্রহ নিয়েই কুশলাদি জিজ্ঞেস করল, রোস্তম ভাই কেমন আছেন? শরীর স্বাস্থ্য ভলো আছে? কই যাইতেছেন? ইত্যাদি ইত্যাদি।
রোস্তম ফকির এর আগেও এ রাস্তায় অনেক যাতায়াত করেছে। অনেকের সামনে পরলেও দেখেও দেখতো না। ফকির বলে অনেকেই অবজ্ঞা করতো। তবে আজ রোস্তম ফকিরের প্রতি সেই অবজ্ঞা ভাব আর নেই। তার সম্মান যেন হঠাৎ করেই বেরে গেছে। আজকের মতো এতো কুশলাদি কখনও কেউ জিজ্ঞাস করে নাই। দুর্ধর্ষ চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে রিলিফ চুরির প্রতিবাদ করায় তার জনসমর্থন হঠাৎ করেই অনেক বেড়ে গেছে। রোস্তম ফকিরের নাম এখন অত্র এলাকার মানুষের মুখে মুখে। চেয়ারম্যানের ভয়ে যারা রোস্তম ফকিরের এই কাজের প্রশংসা মুখে উচ্চারণ করতে পারছে না তারাও মনে মনে তাকে ধন্যবাদ দিচ্ছে।
সারাদিন সারারাত না খাওয়া শরীরে রোস্তম ফকিরের হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। তারপরও সে ঐ ইউনিয়নের সীমানার ভিতর ধনী-গরীব কারো কাছেই ভিক্ষার আবদার করল না। তার ধারণা, ভিক্ষা চাইলে যদি চেয়ারম্যানের দেয়া রিলিফের গম বের করে দেয়। পণ করেছে না খেয়ে মরে গেলেও চেয়ারম্যানের দেয়া কোন কিছু সে গ্রহণ করবে না।
বয়সের ভারে ন্যুজ্ব তারোপর দুর্বল শরীর। অভুক্ত থাকায় একটু হাঁটলেই শরীর অস্থির লাগে। একটু পর পর বসে জিরিয়ে নিয়ে আবার হাঁটা শুরু করে। এভাবে হাঁটতে হাঁটতে সকাল ৯টার দিকে তিন মাইল দূরে পাশের ইউনিয়নে গিয়ে পৌঁছল। সেখানে ভিক্ষা চাইলে দু’এক ঘর থেকে ভিক্ষা দিলেও বেশিরভাগ লোকই নিষেধ করে দিল। রাস্তায় আশ্রয় নেয়া অনেকের ঘরেই বাড়ন্ত চাল ডাল নেই, যে কারণে ভিক্ষা দেয়ার ইচ্ছা থাক সত্বেও দিতে পারছে না। অনেকে আবার ভিক্ষা না দিয়ে উল্টো তিরস্কার করল। রোস্তম ফকির ভিক্ষাবৃত্তিতে নেমে তিরষ্কার শুনতে শুনতে অভ্যাস্ত হয়েছে, কাজেই তিরস্কার শুনেও কাউকে কিছু বলল না।

আরো কয়েক ঘর পার হওয়ার পর একটি ঘরে ভিক্ষা চাইতেই ঘর থেকে একটি মধ্য বয়স্কা মহিলা বের হয়ে বলল, চাচা, আপনি সকালে ভাত খাইছেন?
রোস্তম ফকির বলল, না গো মা, আমি কাল থাইকা না খাওয়া।
এমন ক্ষুধার্ত ভিক্ষুকই তিনি খুঁজছিলেন। ভিক্ষুকের দু’দিন না খাওয়ার কথা শুনে মহিলা বলল, আপনি যদি একটু দেরি করেন তাইলে আমি আপনারে চারটা ডাল ভাত খাওয়াইবার চাই?
খাওয়ানোর কথা শুনে রোস্তম ফকিরের চোখ জ্বল জ্বল করে উঠল। ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে। ভাতের কথা কানে যেতেই ক্ষুধা যেন আরো বেড়ে গেল। অভুক্ত শরীরে আর হাঁটতে মন চায় না। হাত পা অবস অবস লাগছে। পা যেন আর চলতে চায় না। পেটে দানা পানি কিছু একটা দেয়া দরকার। খাবারের কথা শুনে তাড়াতাড়ি বলল, কতক্ষণ দেরি হইবো মা–?
ভিক্ষুকের খাওয়ার আগ্রহ দেখে মহিলা বলল, তরকারী চুলায় আছে, রান্না হইতে বেশি দেরি হইবো না।
রোস্তম ফকির খুশি হয়ে বলল, ঠিক আছে মা, আমি বইসা পড়লাম, আপনে রান্না করেন। এই বলে লাঠিটা মটিতে বিছিয়ে তার উপর বসে পড়ল।

মহিলা রান্না শেষ করে এক প্লেট গরম ভাতের সাথে কয়েক টুকরা মুরগীর মাংস ঝোলসহ রোস্তম ফকিরের সামনে এনে দিল। দু’দিনের ক্ষুধার্ত। এক প্লেট বাসি পান্তা ভাত পেলেই সে খুশি সেখানে মুরগীর মাংস দেখে খুশিতে প্রায় কেঁদে ফেলার অবস্থা। ক্ষুধায় তর সইছে না, পারলে হাত না ধুয়েই খেয়ে ফেলে, এমন সময় মহিলা কাঁসার গ্লাস ভরে পানি এনে দিলে তাড়াতাড়ি হাত ধুয়ে খেতে লাগল। ভাত যেন তার কাছে অমৃতের মত মনে হচ্ছে। সারাজীবন অনেক ভাত খেয়েছে কিন্তু আজকের ভাতের মত এত স্বাদ যেন আর কখনও পায়নি। খুব তৃপ্তিসহ সব ভাত খেয়ে ফেলল। খাওয়া শেষে রোস্তম ফকির বলল, মাগো, মুরগীর তরকারী দিয়া ভাত খায়া খুব খুশি হইছি মা। কি উদ্দেশ্যে খাওয়াইলেন মা? কইলে একটু দোয়া কইরা দেই।
মহিলা অদূরেই দাঁড়ানো ছিল, তার কথা শুনে তাড়াতাড়ি বলল, আমার ছোট পোলাডা কয়েক দিন হইল জ্বর। ভাল হইতেছে না। আমার পোলাডার জন্য একটু দোয়া কইরা দ্যান চাচা–, যেন আমার পোলা তাড়াতাড়ি সুস্থ্য হয়া উঠে।
রোস্তম ফকির তার দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, ঠিক আছে মা, আমি এহনই দোয়া করতেছি। বলেই দু’হাত তুলে মোনাজাত করতে লাগল। ”আল্লা গো– আমি দু’দিন না খায়া আছিলাম। আইজ মুরগীর মাংস দিয়া তৃপ্তিসহকারে এই বড়ির মা জননী আমারে খাওয়াইছে। আল্লা গো– অতীথ-মুসাফির, ফকির-মিসকিন কারো বাড়িতে খায়া খুশি হইলে সেই খুশিতে তুমিও বড় খুশি হও, আমি খুব খুশি হইছি গো আল্লা, আল্লাগো–আমার খাওয়ার উছিলায় মা জননী যেই নিয়ত করছে সেই নিয়ত পুরণ কর গো আল্লাহ। তার ছেলে অসুস্থ্য, তাকে তুমি সুস্থ্য কইরা দাও গো আল্লাহ। আল্লাহ গো– তোমার এই দুনিয়ায় অনেকেই মানুষরে মানুষ মনে করে না, তাদের অত্যাচারের কাছে সব মানুষ জিম্মি, গরীব মাইনষের হক না হক কইরা খায়, দুর্বল হওয়ায় কিছু বলাও যায় না সহ্যও করা যায় না, তুমি ছাড়া এই দুনিয়াতে আর কারো কাছে বিচার দেয়ার জায়গাও নাই, এইসব অনাচারের হাত থাইকা এদেশের অসহায় মানুষকে রক্ষা কর গো আল্লাহ।” মোনাজাতে এসব কথা বলতে বলতে রোস্তাম ফকির কাঁদতে লাগল। রোস্তম ফকির এর আগেও অনেকের বাড়ি খেয়েছে, অনেক দোয়া করেছে কিন্তু হৃদয় থেকে এমন দোয়া আর কখনও করে নাই। অন্তর থেকেই যেন অনেক কথা মনের অজান্তেই বেরিয়ে এলো। দু চোখ বেয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি গাল বেয়ে পড়তে লাগল। মোনাজাতে তার কান্না দেখে বিশ্ব বিধাতার মন নরম হলো কিনা জানিনা, তবে অন্নদাতা মহিলার হৃদয় অত্যন্ত নরম হলো। অনেক বড় বড় আলেমদের তিনি খাইয়েছেন কিন্তু এরকম আন্তরিকতা পূর্ণ মোনাজাত কেউ কখনও করেছে কিনা তার মনে পড়ে না। মোনাজাত শেষে চোখের পানি মুছতে মুছতে রোস্তম ফকির চলে যেতে উদ্যত হলে মহিলা ফকিরকে উদ্দেশ্য করে বলল, চাচা একটু দাঁড়ান।
রোস্তম ফকির দাঁড়াল। একটু পরেই মহিলা এক কেজি চাল, পাঁচ ছয়টি শুকনা মরিচ, কাগজের পুটলিতে একটু লবন এবং আধাপোয়া পরিমাণ খেসারির ডাল এনে দিল।
রোস্তম ফকির এসব পেয়ে খুশি হয়ে বলল, মাগো– মুরগীর মাংস দিয়া ভাত খাওয়ানোর পর, আবার চাইল-ডাইল দিলেন ক্যান মা?
— আপনার মোনাজাতে আমি খুব খুশি হইছি চাচা, আপনি বাড়ি গিয়া আমার দেয়া চাল-ডাল খায়া পাঞ্জেগানা নামায পইড়া আবার একটু আমার পোলার জন্য দোয়া করবেন।
রোস্তম ফকির খুশি হয়ে চাল-ডাল ঝোলার ভিতর ঢেলে নিয়ে নিজ এলাকার দিকে রওনা হলো। আর কারো বাড়িতে ভিক্ষা করতে গেল না। ভিক্ষা থেকে ফিরে সারাদিন শুয়ে বসে সবার সাথে সময় কাটালো।
এলাকায় রোস্তম ফকিরের কদর অনেক বেড়ে গেছে। এর আগে রোস্তম ফকির ভিক্ষা চাইলে অনেকেই বিরক্তবোধ করত। এখন খুব একটা বিরক্তবোধ করে না। বরঞ্চ আগের তুলনায় ভিক্ষার পরিমাণ একটু বেশিই দিতে লাগল।
প্রায় চৌদ্দ পনরো দিন পর বন্যার পানি অনেকটা কমে গেল। বাড়ির উঠান জেগে উঠায় বেশিরভাগ লোকজনই গরু-ছাগল নিয়ে নিজের বাড়িতে ফিরে গেছে। বাঁধ থেকে সবাই চলে গেলে এক সময় রোস্তম ফকিরও তার নিজের ঘরে ফিরে যায়। আরো দু’মাস পরে বন্যার পানি শুকিয়ে গ্রামের রাস্তাঘাট পুরোপুরি জেগে উঠলে রোস্তম ফকির আবার গ্রামে গ্রামে ভিক্ষা করতে লাগল। তবে, সব গ্রামে ভিক্ষার জন্যে গেলেও ঐ ঘটনার পর থেকে চেয়ারম্যানের গ্রামে সে একদিনও ভিক্ষা করতে গেল না। এই দুই মাসে সরকারি বেসরকারিভাবে অনেক সাহায্য সহযোগীতা এসেছে। গ্রামের অনেকেই অনেক কিছু পেলেও রোস্তম ফকির কোন কিছুর জন্যই আর চেয়াম্যানের কাছে গেল না। চেয়ারম্যানও ক্ষুব্দ হয়ে রিলিফের লিস্ট থেকে তার নাম কেটে দিয়েছে।

চেয়াম্যানের পাশের বাড়ির মানু মিয়া অসুস্থ্য সন্তানের মঙ্গল কামনায় মানত করেছে। মানত অনুযায়ী এলাকার সকল ভিক্ষুকদের একবেলা খাবারের দাওয়াত দিয়েছেন। বেশিরভাগ ভিক্ষুককে রাস্তাঘাটে দেখা পেলেও রোস্তম ফকিরের দেখা পেলেন না। ফকির মিসকিন খাওয়ানোর দাওয়াতে রোস্তম ফকিরকে বাদ দেয়া সমীচিন মনে করলেন না। অবশেষে মানু মিয়া নিজেই রোস্তম ফকিরের বাড়ি এসে দাওয়াত দিলেন। দাওয়াতে রোস্তম ফকিরকে আরো চার পাঁচ জন ভিক্ষুক সাথে নিয়ে যেতে বললেন। রোস্তম ফকির মানু মিয়ার দাওয়াত পেয়ে খুব খুশি হয়ে যা বললেন তা শুনে মানু মিয়া কিছুটা আশ্চার্যই হলেন। অতি বন্যার কারণে চারিদিকে অভাব। ফকিরের পরিমাণ বেড়ে গেছে। প্রতিদিনই ফকিররা এসে খাবারের জন্য বাড়ির উঠানে হততা দিয়ে বসে থাকে। এই তো কয়েক মাস আগেও এই রোস্তম ফকির তার বাড়িতে খাবার চেয়ে কত কাকুতি মিনতি করেছে, অথচ সেই রোস্তম ফকিরকে আজ দাওয়াত দাওয়ার পরও দাওয়াত খাওয়ার সময় পাবে না বলে মাফ চাচ্ছে। ফকিরের দাওয়াত না খাওয়ার কারণ মানুর মাথায় ঢুকছে না। মানু ফকিরের দাওয়াত না খাওয়ার কারণ বুঝতে না পেরে দু’চোখ কপালে তুলে প্রশ্নসূচকভাবে বললেন, কেন ভাই? আপনি কি আমার উপর রাগ করছেন?
কথা শুনে রোস্তম ফকির কি বলবে বুঝতে পারছে না, সহজ সরল মানুষ অনেক সময় অনেক কথার উত্তর খুজে পায় না। তবে সে মানুর উপর রাগ করে নাই, রাগ করেছে ঐ চেয়ারম্যানের উপর, মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছে– চেয়ারম্যানের বাড়ি তো দূরের কথা কখনও আর ঐ চেয়ারম্যানের গ্রামেও ভিক্ষা করতে যাবে না। মানুর বাড়ি চেয়ারম্যানের বাড়ি পাশে হওয়ায় সেকথা সে বলতেও পারছে না। মানু যাতে ভুল না বোঝে সেই দিক চিন্তা করেই সে খপ করে মানু মিয়ার হাত দু’টি চেপে ধরে বলল, আল্লাহর কসম লাগে ভাই, আমি আপনার উপর রাগ করি নাই, আপনি দাওয়াত দিছেন আমি খুব খুশি হইছি, আমারে ভুল বুইঝেন না।
— আপনি কি ঐদিন কোনো খানে যাইবেন?
এমন প্রশ্ন শুনে রোস্তম ফকির বিব্রতবোধ থেকে কিছুটা স্বস্তি পেল, এমনই একটি উত্তর দেয়ার চিন্তা সে করতেছিল, তাই তাড়াতাড়ি জবাব দিল, সব আল্লার ইচ্ছা, আল্লায় ঐ দিন কোন দিকে আমারে নিয়া যাইবো আমি ঠিক কইবার পারতেছি না।
মানু মিয়া কিছুটা বিনয়ের সাথেই প্রশ্ন করলেন, আপনার যখন কোনখানে যাইবার তাগাদা নাই তাইলে আমার বাড়িতে দাওয়াত খাইবেন না ক্যান? আমার অপরাধটা কি কন দেখি?
রোস্তম ফকির এতক্ষণ না যাওয়ার কারণ বুকে চেপে রাখলেও সরলতার কারণে মুখ ফসকে সত্য কথাটি ফস করে বেরিয়ে গেল, নিজের অজান্তেই হাসি মুখে বলল, ভাই আপনারা চেয়ারম্যানের লোক, বড় লোক মানুষ, ঐ গ্রামে আমার মত ফকিরের যাওয়া কি ঠিক হইবো?
চেয়ারম্যানের নাম বলতেই যেতে না চাওয়ার বিষয়টি তার বুঝে আসল। কথা শুনে সে আশ্চার্য হয়ে গেল। একটা চাল চুলোহীন ভিক্ষুকের এত জেদ থাকতে পারে এটা তার কল্পনায় ছিল না। এর আগে সে এরকম ছিল না। শত অপমান করলেও কখনও সে কোন কথার জবাব দিত না। হঠাৎ তার ভিতরে এত দেমাগ কি করে হলো এটা মানু মিয়ার মাথায় আসছে না। তবে মানু মিয়ার রোস্তম ফকিরের দেমাগটাকে যত না ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচারণ মনে হলো তার চেয়ে তার সততা ও অন্যায়ের প্রতিবাদকারী হিসাবে তার প্রতি তত শ্রদ্ধায় মাথা নত হলো। একজন চালচুলোহীন ভিক্ষুকও যে শক্তিধর চেয়াম্যানের অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সাহস রাখে তা এর আগে কখনও দেখে নাই। রোস্তম ফকিরকে আর ফকির মনে হচ্ছে না তাকে রোস্তম পালোয়ান মনে হচ্ছে। এরকম ফকিরকে বাদ রেখে ফকির খাওয়ানোটা তার কাছে আত্মতৃপ্তির মনে হচ্ছে না। রোস্তম ফকিরের কথা যতই ভাবছে ততই তার প্রতি শ্রদ্ধা বাড়তেছে। অনেকটা নরম হয়েই মানু মিয়া বলল, রোস্তম ভাই, চেয়ারম্যান অন্যায় করছে, আমি তো আপনের কাছে কোন অন্যায় করি নাই। আপনে আমার দাওয়াতে যাইতে চাইতেছেন না ক্যান?
রোস্তম ফকির খপ করে মানু মিয়ার ডান হাত চেপে ধরে বলল, মানু ভাই, আমি ঐদিন এই এলাকায় থাকুম না। আপনি দাওয়াত দিছেন আমি খুব খুশি হইছি। আমি আপনার দাওয়াতে যাই বা না যাই তাতে অসুবিধা নাই, তবে যেহানেই থাকি, আমি আপনার জন্য দুপুরের নামায পইড়া আল্লার কাছে দুই হাত তুইলা খাস দেলে দোয়া করমু, তবু ভাই আমারে আর যাইবার কইয়েন না। আমি আপনার কাছে আল্লার ওয়াস্তে মাফ চাই।
রোস্তম ফকিরের দাওয়াত না খাওয়ার জন্য এমন কাকুতি মিনতি দেখে মানু মিয়া আর বাড়াবাড়ি করল না। চেয়ারম্যান আর রোস্তম ফকিরের মধ্যে রিলিফের গম নিয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা মানু মিয়া পুরোপুরি জানে। তাই তাকে আর চাপাচাপি না করে বলল, রোস্তম ভাই, যদি আপনি এই এলাকায় থাকেন, তাইলে দাবী থাকল আমার দাওয়াতে আইবেন।
রোস্তম ফকির মানু মিয়ার সে দাওয়াতে এলো না। ঐ দিন সে অনেক দূরের একটি গ্রামে ভিক্ষা করতে গেল। মানু মিয়ার প্রতি তার কোন অভিযোগ নাই বরঞ্চ তাকে দাওয়াত দেয়াতে খুব খুশিই হয়েছে। শুধু চেয়ারম্যানের পাশের বাড়ি হওয়ায় সে দাওয়াত খেতে গেল না। তবে দাওয়াত না খেলেও অন্য গ্রামের মসজিদে জোহরের নামায পড়ে মানু মিয়ার জন্য নিজে থেকেই দোয়া করল।
মানু মিয়ার দাওয়াতে রোস্তম ফকিরকে না দেখে অনেকেই আশ্চার্য হলো। যে লোকটি এই এলাকার কোন দাওয়াতে অনুপস্থিত থাকে না, সেই লোক না আসার কারণ কি? সবাই মনে করল চেয়ারম্যানের কারণে হয়তো রোস্তম ফকিরকে দাওয়াত দেয় নাই। এমন সন্দেহ থেকে একজন মানু মিয়াকে আস্তে আস্তে বলল, মানু ভাই, রোস্তম ফকিরকে দাওয়াত দেন নাই?
মানু বলল, সবার আগে তারেই কইছি। তার নাকি কোন গ্রামে কাজ আছে, আইতে পারবো না।
কথা শুনে অনেকেই আশ্চার্য হলো। রোস্তম ফকিরের তো কোন কাজ থাকার কথা নয়। যার তিন কুলে কেউ নাই, থাকার ভিটা নাই, এক ছটাক জমি নাই, ঘরে এক মুঠো চাল নাই তার আবার কি কাজ?
পরবর্তিতে দাওয়াতে আসা অনেক ভিক্ষুকের সাথেই রোস্তম ফকিরের দেখা হলো। দাওয়াতে না আসার কারণ জিজ্ঞেস করতেই রোস্তম ফকির খুশি হয়েই তাদের জবাব দিল, মানু ভাই আমারে আমার বাড়ি গিয়া দাওয়াত দিছিল, সময়ের অভাবে দাওয়াতে যাইতে পারি নাই, তয় দাওয়াত খাইবার না পাইলেও আমি খুব খুশি হয়া তার জন্য দোয়া করছি। আল্লায় যেন তাকে সুখে শান্তিতে রাখে। তার মনের ইচ্ছা যেন আল্লাহ পুরণ করে।
অনেক ভিক্ষুক তার এ কথায় পাল্টা প্রশ্ন করে বলল, রোস্তম ভাই, আপনে না খায়াই মানু মিয়ার জন্য এত দোয়া করলেন?
তাদের এ কথায় রোস্তম ফকির কিছুটা রাগান্বিত হয়েই মুখটা উপর নিচে ঝামটা মেরে বলল, কন কি? দোয়া করমু না মানে? হে আমারে খুশি মনে নিজে আইসা দাওয়াত দিছে। আমার রিযিক হের বাড়িতে আছিল না তাই খাই নাই। তাই বলে হেরে দোয়া করমু না। এইডা কি কথা কইলেন?
সহজ সরল রোস্তম ফকির রেগে যাওয়ায় ভিক্ষুকেরা আর দ্বিতীয় কোন প্রশ্ন করার সাহস পেল না।
(— চলবে —)

Loading

Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *