মজার চিকমিক (রম্য)

শহীদুল ইসলাম প্রামানিক

হেইদিন আমার বাসার পোলাপানেরা সকাল বেলা দেহি বাড়ির মধ্যে খুব হইচই শুরু কইরা দিছে। আমার বউরে জিগাইলাম ব্যাপার কি?
আমার বউ কইল, হেরা ব্যাবাকতে মিল্লা ‘চিকমিক’ খাইবো।
আমি বউয়ের মুখের দিকে হা কইরা চাইয়া রইলাম। ‘চিকমিক’ খাইব এমন কথা তো জীবনে হুনি নাই। আমার চউনি দেইহা বউ কইল, এমুন কইরা চাইয়া রইছ ক্যান?
কইলাম, জীবনে বহু কিছু খাইছি কিন্তু ‘চিকমিক’ তো কুনুদিন খাই নাই। এইডা আবার কেমুন খাওন।
বউ কইল, এইডা আবার কেমুন কথা কইলা, গত বছর যে স্বপ্নপুরী গিয়া খাইলা, হেইডাই তো ‘চিকমিক’।
আমি কইলাম, গত বছর তো স্বপ্নপুরী গিয়া মুরগীর রান আর পোলাও মাংস খাইছি ‘চিকমিক’ তো খাই নাই।
বউ কিছুডা বিরক্ত হইয়া কইল, আরে বোঝ না ক্যান? ব্যাবকতে মিল্লা চান্দা তুইলা গাছ তলে ভাত রাইন্ধা খায় হেইডাই তো ‘চিকমিক’।
আমি তহন বুঝতে পারলাম এইডা ‘পিকনিক’। বউরে কইলাম, আরে ব্যাক্কল এইডা ‘চিকমিক’ না ‘পিকনিক’।
বউ ঝামটা মাইরা কইল, ওই তো হইলো, ওইডাই ‘চিকমিক’ ।
আমি ছোড একটা ধমক দিয়া কইলাম, আরে ব্যাক্কল আবার কয় ‘চিকমিক’, ওইডা হইল ‘পিকনিক’।
বউ বিরুক্ত হইয়া কইল, ওইতো হইলো, যা কইছি তো কইছি, আমার মুখ দিয়া আইসে না, যা কইছি ওইডাই ‘চিকমিক’।
বুঝলাম এ্যারে বুঝায়া লাভ নাই। এই মহিলারে আমি বিয়ার পর থিকাই চিনি, কিছু কথা আছে যা জীবনেও শুদ্ধ কইরা কওয়ার চেষ্টা করে না, আবার চেষ্টা কইরাও শুদ্ধ কইরা কইতে পারে না। কাজেই ওইসব বাদ দিয়া জিগাইলাম, পোলাপানে চান্দা উডাইছে কত?
বউ আঙুলে গুইনা গুইনা হিসাব কইরা কইল, ২৪জন মিল্লা ১৫০/- টেকা কইরা ৩৬শ’ টেকা উডাইছে।
জিগাইলাম, পাক করবো কেডা?
বউ কইল, দেইল্লা পাগলা।
আমি মুখটা ব্যাকা কইরা অবজ্ঞা সুরে কইলাম, দেইল্লা পাগলা জীবনে কুনদিন রোষ্ট পোলাও পাক করছেনি?
বউ আশ্চার্য হইয়া কইল, কও কি? দেইল্লা পাগলা মসলা ছাড়াই রোষ্ট পাক করে। একবার খাইলে পাগোল হয়া যাইবেন। বউয়ের কথা শুইনা অর্ধেক পাগোল এমনিই হইয়া গেলাম। বল্লাম, এ রান্নার তদারক করে কেডা?
বউ কইল, বাড়ির পোলাপান আশা করছে চিকমিক খাইবো, ওগো আশা কি নিরাশা করা যাইবো? আমাগোই তদারকি করা লাগবো। চাইয়া দেহি পোলাপান সব খুশির চোটে কাজ করতেছে। কেউ হলুদ মরিচ পেশাপেশি করতেছে, কেউ পিয়াজ-রসুন ছিলতেছে, কেউ মশলা পিশতেছে সে এক এলাহী কান্ড। খাওয়ার কি আনন্দ হইবো জানিনা তবে তাদের কাজের আনন্দ দেইহা মনে হইল এইডাই পিকনিকের আসল আনন্দ। বাবুর্চি দিয়া রান্না করলে এরা জীবনেও এই আনন্দ পাইবো না।
আমার বাইরে কাজ থাকায় সারাদিন বাড়িতে ছিলাম না। বিকাল বেলা বাড়ি আইসা দেহি, আমারই ঘরের বারান্দায় সব পোলাপান পাকার উপর বইসা হইহুল্লোর কইরা পোলাও রোস্ট খাইতেছে। দেইল্লা চামুচ দিয়া সমান কইরা প্লেটে প্লেটে উঠায়া দিতেছে। আমাকে দেইখা কয়েকজন পোলাপান চিল্লায়া উঠল, এই দেইল্লা, আংকেলরে এক প্লেট দে, আংকেলরে এক প্লেট দে। আমি না না করতেও একপ্লেট আইনা দিল। খায়া দেহি রোষ্টের চেয়ে রোষ্টের ঝোল অসম্ভব স্বাদ হইছে। কিন্ত রোষ্টের ভিতর তেমন একটা মসলাপাতি নাই। খায়া আসলেই পাগোল হওয়ার অবস্থা। দেইল্লারে জিগাইলাম, দেইল্লারে, তুই এই রোষ্ট কেমনে পাক করলি রে বাজান?

দেইল্লা খুশি হইয়া কইল, আংকেল পিয়াজ লাল কইরা, গরম মসলা আর আদার রস দিয়া নাড়াচাড়া কইরা, টক দই আর ভিনেগার দিছি, তাতেই স্বাদ হইছে। রান্না যেমনেই করুক, রান্না যে স্বাদ হইছে সেই খুশিতে ওরে আর কিছু জিগাইলাম না। তবে পাশের বাড়ির এক ছেলেরে ডাক দিয়া জিগাইলাম, বাজান দেড় শ’ টেকা দিয়া ‘চিকমিক’ কেমুন খাইলা? পোলায় খুশি হইয়া কইল, আংকেল কি কি খাইলাম এবার হোনেন–

১। একটা আস্ত মুরগীর ডিম সেদ্ধ, তাও আবার ছাল ছাড়ায়া তেল, লবন, হলুদ, মরিচ দিয়া ভাজাভাজা।

২। একখান মুরগীর আস্ত রানের রোষ্ট (এক মুরগী চার ভাগের এক ভাগ)। রোষ্টের সাথে দুই চামুচ থকথকা ঝোল ফ্রি।

৩। দশখান গরুর মাংস, সাথে পিয়াজ দেয়া ঘন গাঢ় ঝোল ইচ্ছামতো।

৪। এক গামলা সাদা পোলাও, চাইলে আরও দিছে, দেনেওয়ালা না করে নাই।

৫। লবন দিয়া মাখানো শশা গাজরের সালাদ, সাথে এক ফালি লেবু

৬। সকাল বেলা মুরগীর গিলা কলিজা ভুনা দিয়া পেট ভইরা খিচুরী।

৭। চাপ কলের এক বালতি ঠান্ডা পানি, যে যত খাইতে পারে।

হিসাব দেয়ার পর কইল, আংকেল যা খাইছি, প্যাটে কুলায় না। এতো খাওয়ার পরেও তের টাকা বেশি হইছে, এক পোয়া লবন বেশি হইছে, দুই কেজি লাকরী বেশি হইছে, জিরা, মশলা, তেলের কথা তো আংকেল ধরি নাই। ছেলেটার আত্মতৃপ্তি দেইখা নিজেও তৃপ্ত হইলাম।

Loading

Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *